Golden Cauldron Logo

রাক্ষস


by published


-'তার মানে তুই মীরার সাথেই থাকবি ঠিক করেছিস? তাহলে কেন সেদিন আমাকে বিয়ে করবি বলেছিলিস?'

-'মীরার কথা কখন বললাম?'

-'তোর হাবেভাবে সেটা ভালোই বোঝা যায়। কী ভেবেছিলিস আমি কিছু বুঝতে পারি না? ফোন করলে তোকে পাওয়া যায় না, রোজ রোজ রাত করে ঘরে ফিরিস। আর অফিস যাওয়ার নাম করে Acropolis-এ কী করছিলিস তুই?'

-'তোকে এসব কে বলল?'

-'যেই বলুক! I am warning you Akash, তুই যদি ওই মেয়েটার সঙ্গে সম্পর্ক রাখিস, আমি কিন্তু স্টেপ নেবো। তোর বাড়ি গিয়ে সব বলে দেব!'

-'একশোবার যাব! বেশী গলাবাজি করলে গলা টিপে রেখে দেব শয়তান মেয়েছেলে!'

ঠিক তারপরেই একটা চড় এসে রিনির গালের ওপর পড়বে আর রিনি লুটিয়ে পড়বে মেঝেতে। কিন্তু, আকাশ তাতেও থামবে না- চড়, লাথি, ঘুষি লাগাতার রিনির ওপর বর্ষণ করবে, যতক্ষণ না মেয়েটা অজ্ঞান হচ্ছে। তারপরে আমি এসে রিনির মুখ চেটে চেটে ওর জ্ঞান ফিরিয়ে আনব আর রিনি কোনোরকমে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। পরেরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট বানাতে বানাতে যখন আকাশের নজর রিনির ক্ষতবিক্ষত মুখটার দিকে যাবে তখন যথারীতি আকাশ রিনিকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে। কখনও কখনও দেখব যে নিজেই নিজেকে চড় মারছে। অবশেষে দেখতাম রিনিই আকাশকে সান্তনা দিচ্ছে!

এভাবেই চলছিল, কিন্তু, মাসকয়েক ধরে সেই সকালের মেলোড্রামাটি আর দেখতে পেতাম না। না না, মিল হয়নি দুজনের। বরঞ্চ আকাশের নেশা করার স্বভাবটা আরও বেড়ে চলেছে। মদ খেয়ে টলতে টলতে যখন বাড়ি ঢোকে, রিনি কিছু বলতেই তার গায়ে আঘাত করে আকাশ।কপালে বেধড়ক মারধোর জুটত। আমি মাত্র একদিন প্রতিবাদ করেছিলাম। ভেবেছিলাম রিনির কান্নায় না হোক, আমার কর্কশ স্বরে হয়তো আকাশের হুঁশ ফিরবে। কিন্তু তার বদলে ওর লকলকে বেল্টটা যে সপাং করে আমার পিঠে দাগ বসিয়ে দেবে জানতাম না। আর্তনাদ শুনে রিনি ছুটে আসে আমাকে বাঁচানোর জন্য। জড়িয়ে ধরে আড়াল করে রাখে আমাকে, আর বেল্টটা হওয়ায় উঠে সজোরে নামতে থাকে রিনির পিঠের ওপর। উঃ! সেইদিনটার ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।

অথচ, এরকম বিভিষিকাময় জীবন ছিলনা আমাদের কারুরই। রিনির তিনকূলে কেউ নেই, ওর ছোটবেলাটা অনাথ আশ্রমেই কেটেছিলো। বলা যায়, প্রায় নিজের উদ্যোগে পড়াশোনা শেষ করেছিল। বছর কয়েক আগে যখন সে বেশ ভালো চাকরি পায়, সেইরকম সময়েই আমাকে তখন রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনে রিনি। যাইহোক, আকাশের সঙ্গে রিনির আলাপ অফিসেই। আর ঘটনাচক্রে দুজনেই একই প্রজেক্টের কাজে ঢুকে পড়ে। এই কাজের জন্য আমাদের বাড়ীতে আকাশের প্রায়ই আসা যাওয়া লেগেই থাকত। সত্যি বলতে কী, প্রথম দেখায় আকাশকে আমার সুবিধার লাগেনি। অজান্তে বুকের ভীতরটা ধক্ করে উঠেছিল। প্রজেক্টের কাজ শেষ হলেও আকাশ নানারকম ছুতো করে ঠিক আমাদের বাড়ীতে এসে পড়ত। কোনোদিনই আমার ওকে সহ্য হত না, ও এলেই মড়াকান্না জুড়ে দিতাম, ঘরে ঢুকতে দিতাম না, রিনি ওর সঙ্গে কথা বললে রিনির স্কার্ট ধরে টানাটানি করতাম। এভাবে রিনিকে বহুবার সাবধান করেছিলাম।

কিন্তু, আকাশের প্রতি রিনির অন্ধপ্রেমই বাধ সেধেছিল।এরপর আকাশ আমাদের ফ্ল্যাটেই থাকতে আরম্ভ করল। ঘোরাঘুরি, খাওয়া দাওয়া করে অনেক রাতে যখন দুজনে বাড়ী ঢুকত, আমি আদৌ কিছু খেয়েছি কিনা সেদিকে রিনির ভ্রুক্ষেপ থাকত না। এছাড়া অফিসট্যুর, পিকনিক, পার্টি, প্রজেক্ট, মিটিং এগুলো হরদম লেগেই থাকত। আমি বড়ো হয়েছি বলে রিনি আমাকে আগের মতো বিশেষ সময় দিতে পারত না, তবুও এত ব্যাস্ততার মাঝে রিনির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অদ্ভূতভাবে অটুট ছিল। অদ্ভূত এই কারণেই, যে আকাশের সঙ্গে বাড়তি মেলামেশা করা সত্ত্বেও, অবশেষে, যেটা ভেবেছিলাম সেটাই হয়েছিলো। আকাশ আর রিনির বিবাদ। ঘটনাটা ছিল রিনির প্রোমোশন নিয়ে- আকাশ রিনিকে চাকরি কিছুতেই করতে দেবে না। কারণটা আমি দরজায় আড়ি পেতে শুনতে পাই 'মা যদি জানতে পারে যে তুই আমার চেয়ে বেশী মাইনে পাস, কী ভাববে বল তো? তাছাড়া আমি তো আয় করছি নাকি? আমাদের বিয়ের পর, তুই যদি সময় না দিতে পারিস তাহলে কী হবে বল? তুই কি চাস আমি চলে যাই?'। রাগে গা জ্বলে উঠল আমার! রিনি চুপ করে শুনছেই বা কেন? কেন আকাশকে তাড়িয়ে দিচ্ছে না? কিন্তু অনাথ মেয়েটার মনে অজস্ত্র কৌতূহল ছিল সংসার করার প্রতি। ওর চোখ দেখেই সেটা বোঝা যেত। আকাশকে হারানোর ভয়ে, আমি দেখলাম রিনি নিজের চাকরি ছেড়ে দিল।

তারপর যা হয়, উন্নত্তির শিখরে পৌঁছে গিয়ে মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি বিবেকের বিসর্জন দেয় তখনই শুরু হয় সর্বনাশের। আকাশের ক্ষেত্রেও সেটাই হল! কোথায় সেই ভ্যালেন্টাইন্স্ ডে, কোথায় কী? রোজ রাতে মদ খেয়ে টলতে টলতে বাড়ি ঢোকে, শুরু হয় অকথ্য ভাষায় গালাগালি। ক্রমে মারধোরের পর্যায় চলে যায় সেটা।

আমাকে বাঁচানোর পরে রিনি বেল্টের মার খেতে খেতে, একসময় পাশে রাখা ফুলদানিটা দিয়ে আকাশের কপালে আঘাত করে! ভলোবাসা দিলে, আমার মতো কুকুরেরাও মানুষ হয়, কিন্তু মানুষ কীভাবে পশুতে পরিনত হয় সেটা আকাশকে দেখে বুঝেছিলাম। আমাকে লাথি মেরে ঘর থেকে বার করে দিয়ে দরজা আটকে দিল। ভিতর থেকে বেল্টের 'সপাং-সপাং' শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভেসে আসছে রিনির গোঙানির আওয়াজ, না জানি কী করছে ও রিনির সাথে। পিঠ দিয়ে দরজায় আঘাত করেও খুলতে পারছিলাম না। শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত আমি, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই।

অবশেষে ভোর হলো। আড়চোখে দেখলাম আকাশ জামা চাপিয়ে কোথায় যেন চলে গেল। পিঠের ব্যাথাটা সারেনি তখনও, ও বেরিয়ে যেতেই হঠাৎ খেয়াল হল রিনির কথা! ও ঠিক আছে তো? আবছা আলোয় দেখলাম বেডরুমের দরজাটা খোলা। পা টিপেটিপে ঘরে যেতেই দেখলাম কালকের ফুলদানিটা টুকরো টুকরো হয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে। রিনির ছেঁড়া টপটা পড়ে আছে এককোণায়। আর রিনি ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে। ডাকব? না না ঘুমোচ্ছে হয়তো। কিন্তু আর কত ঘুমোবে রিনি? বেলা ১২টা বাজতে চলল অথচ একভাবে পড়ে আছে! ও খেতে দেবে না? আমার ওপর অভিমান করল? একঝাঁক কৌতূহল নিয়ে যখন ওর গায়ে স্পর্শ করেছিলাম, নিজের বুদ্ধিবিবেচনায় প্রচন্ড ঘা খেলাম। সমস্ত স্নায়ু তোলপাড় করে আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিল যে দেরী হয়ে গেছে! বড্ড দেরী হয়ে গেছে!

চোখ খুলে আছে রিনি। শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা, কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। মেন দরজাটা খোলার চেষ্টা করতেই দেখলাম সেটা বাইরে থেকে আটকানো। আকাশের কাজ। যাতে আমার ডাক কেউ শুনতে না পারে সেই বন্দোবস্ত করে রেখেছে। রিনির কাছে আর গেলাম না লজ্জায়।

ঘরের লম্বা আয়নায় নিজের মিশমিশে কালো শরীরটার দিকে চেয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। নাহ্! আকাশ আর আমার মধ্যে একটাই পার্থক্য আর সেটা হলো দাঁতের! বিকট শদন্ত থাকা সত্ত্বেও আমি এর 'সঠিক' প্রয়োগ জানিনা। ওদিকে, আকাশ-রূপী রাক্ষসটার দাঁত নেই, তবুও কেমন অবলীলায় নিজের নির্মমতার পরিচয় দিয়ে গেল। কে বলতে পারবে যে রিনির মতো মীরার অবস্থা হবে না? তাই আমি আর ডাকাডাকি না করে ড্রয়িং রুমের একপাশে বসে রাক্ষসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আজ ওকে কৈফিয়ত দিতেই হবে, কীসের দোষে ও আমাকে অনাথ করার দুঃসাহস পেয়ে গেল?

সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নামল। আমি বসে আছি ঠায়। আমি জানি ও এখন কোথায় যেতে পারে- মীরা নামক মেয়েটার কাছেই ও এখন যাবে। ঠিক আছে, আনন্দ করে নাও আকাশ। রাত আরও বাড়ল। দেখলাম রাক্ষস গেট খুলে ঢুকছে ফ্ল্যাটে। অন্ধকারে সে আমায় খেয়াল করল না। দুলতে দুলতে সে আলো জ্বালানোর আগেই আমি তার সামনে দাঁড়ালাম। এতটা সাহস কী করে আমার হয়ছিল তখন জানতাম না। যেটার জন্য তৈরী হয়ে ছিলাম ঠিক সেটাই হল। রাক্ষসের হাতদুটো কোমরের কাছে যেতেই আমি তার গলা লক্ষ্য করে এক লাফ দিলাম। ততক্ষণে আমার দাঁত বসে গেছে ওর গলার টুঁটিতে। রাক্ষসটা প্রাণপণ চেষ্টা করল আমাকে ফেলে দেওয়ার কিন্তু লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। ঠিক রিনির মতো! আমি তবুও মরণকামড় আলগা করলাম না। আর্তনাদটা গোঙানিতে পরিণত হওয়ার পরেও ছাড়লাম না। আলো-আঁধারিতে প্রবল ধস্তাধ্বস্তির ফলে ভাঙচুর হলো। রাক্ষসটা একটা বড়ো কাঁচের টুকরো বিঁধিয়ে দিল আমার পিঠে। না না না! আজ একে ছাড়া যাবে না! রিনিকে ও এর চেয়েও বেশী আঘাত দিয়েছে! শ্বদন্ত যেন আমার আদেশের অপেক্ষাতেই ছিল। রাক্ষসের গলার চামড়া, মাংস ভেদ করে সে আরও গভীরে যেতে লাগল। ফিনকি দিয়ে বেরোতে লাগল তরল রক্ত! কামড় তবুও আলগা করিনি, ভয়াল শ্বদন্ত আজ তার আদিমরূপে ফিরে এসেছে! রক্তে ভিজে গেছে দুজনের শরীর, নেতিয়ে পড়েছে রাক্ষস, তবুও তীব্র আক্রোশে আমার শ্বদন্ত নিজের কাজ করে চলেছে। একসময় ছিন্নভিন্ন করে দিল গলার নলি। রাক্ষস যন্ত্রণায় ছটফট করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। ওর দেহে যতক্ষণ সাড় ছিল ওকে আমি ছাড়িনি।

কাঁচটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে আমার পিঠ। রক্তের স্রোত বইছে আমার শরীর থেকে। ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ। রাক্ষস নিধনের পরে মাথা উঁচু করে রিনির বেডরুমে ঢুকলাম। এখনো ঘুমোচ্ছে রিনি! অনেকদিন পর আমি ওর কোলের কাছে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়লাম ঠিক ছোটবেলার মতো।