Golden Cauldron Logo

বিশ্বাসে মেলায় বস্তুু


by published


শাড়ীর প্রতি বরাবরই আমার আগ্রহ কম কিন্তু কাঁচের বাস্কের মধ্যে সযত্নে রাখা ১৫-২০ বছরের পুরোনো সেই শাড়ীটা দেখে যেন চমকে উঠলাম। বটল্ গ্রীন রঙের বালুচরী। বেশ পুরোনো হলেও আঁচলে মুগার নকশাগুলি বেশ স্পষ্ট! আমার হঠাৎ মনে পড়ল, বহুদিন আগে একটা article-এ পড়েছিলাম যে পুরাণের চরিত্র বা পশুপাখির নকশা শাড়ীতে বুননশিল্পই হল বালুচরীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট। তবে আমার সামনে রাখা সেই শাড়ীতে শকুন্তলা বা ময়ূরের নকশা নেই ঠিকই, কিন্তু সেই নিখুঁত কারুকার্জ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছে। যেন কিছু একটা বোঝাতে চাইছে। আরও কাছে যেতেই অবাক হয়ে গেলাম। অতি অদ্ভূত দৃশ্য! আঁচলে মুগাসুতো দিয়ে বোনা রয়েছে বিষ্ণুপুরের পাথর দরজা, তার একটু দূরেই একজন মানুষ কামান দাগছে। আরও এক পা এগিয়ে গেলাম, এইবার মানুষটিকে চিনতে খুব বেশী কষ্ট করতে হল না। স্পষ্ট দেখলাম তার মাথার মুকুটে শিখিপাখা গাঁথা। ঠিক দেখছি তো? স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ কামান দাগছেন! এও হয়?

এই ছিল আমার শাড়ী দেখে চমকে ওঠার কারণ। কতক্ষণ যে একভাবে চেয়েছিলাম জানিনা। পিছন থেকে অম্বরের গলা এল-

-'কীরে ছোড়দা তুই এখনো এখানে দাঁড়িয়ে? চল্ হোটেলে ফিরবি চল্!'

-'আসছি। তুই কোথায় চলে গিয়েছিলি? আর মায়ের কেনাকাটা হল?'

-'আমি ঠিকই ধরেছিলাম, যে তুই এখানেই থাকবি! আরে আমরা দোকানে ওয়েট করছিলাম। তারপর সবাই ভাবলাম যে তুই হোটেলে চলে গিয়েছিস। আমি কী আর জানতাম যে মিউজিয়ামটা দোতলা! তুই তো ফোনটাও-'

-'আচ্ছা আচ্ছা! আগে বল মায়ের কেনাকাটা হল?'

-'হয়নি। বলল যে কয়েকটা বাকি। সারাদিন ধকল গেছে তাই কালকে মন্দিরশ্রেনী, রাসমঞ্চ দেখে আবার দোকানে যাবে।'

ততক্ষণে আমরা বিষ্ণুপুরের সংগ্রশালা থেকে বেরিয়ে হোটেলের দিকে চলেছি। আর পরের মাসে আমাদের বড়দার বিয়ে, তাই সারাদিন জার্নি করার পরেও সমস্ত ক্লান্তি ভুলে সবাই হইহই করে কেনাকাটা করছে। আমি আগেই বলেছি, শাড়ী সম্পর্কে আমার আগ্রহ কম। এমনকী, শপিং নিয়ে কোনোদিনও মাতামাতি করিনা বরং একটু একা থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। দাদার বিয়ের জন্য আনন্দ হচ্ছিল অবশ্যই, কিন্তু আমার মনে এখন অন্য চিন্তা ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাইয়ের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটছি আর মন পড়ে আছে ওই আঁচলের নকশার মধ্যে। কী একটা কথার উত্তর না পেয়ে অম্বর আমাকে চেপে ধরল। বকবক করলেও আমার গাম্ভীর্য ছেলেটার চোখ এড়ায়নি। তার ছোড়দার এই হেন বদলের কারণ সে না জেনে ছাড়বে না। মনে মনে বললাম যে সামান্য শাড়ী নিয়ে অতটাও ভাবতে যাওয়া ঠিক হয়নি। অবশেষে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার সব চেষ্টাই বিফল হল অম্বরের জেদের কাছে। তাকে পুরো বণর্ণা দিতেই সেও দেখলাম আমার মতো গম্ভীর হয়ে গেল।বলল 'দ্বাপরযুগে কামান ছিল বুঝি?'

- 'অসম্ভব। আমারও এখানেই খটকা লাগছে।'

- ‎'দ্বাপরযুগে কৃষ্ণ যদি থাকেন, তাহলে মহাভারতের যুদ্ধে কামানের ব্যবহার কথা তো থাকতই!'

নানারকমের আলোচনা করেও যেন এর তল পাওয়া গেল না। অগত্যা অন্ধকার নামার একটু পরেই আমরা দুজন হোটেলে ঢুকলাম।

মধ্যযুগের সময়। শেষ রাতে একটা বিকট আওয়াজে চারিদিক কম্পিত হল। গগনভেদী সেই তীব্র আওয়াজে বিষ্ণুপুর গড়ের শক্ত দেওয়ালগুলির যেন চূর্ণ হবার উপক্রম। গড়ের একটি ছোট্ট কক্ষে জনা দশেক মানুষ ব্যাকুলভাবে হরিনাম জপ করে চলেছে। অনেক কাল পর, এক ব্যক্তি প্রবেশ করল সেই আলো-আধাঁরি কক্ষে। ভিড়ের মধ্যে থেকে এক দীর্ঘকায় সুদর্শন ব্যাক্তি জপ থামিয়ে উঠে এলেন। সভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

-সেনাপতি, কী সমাচার এনেছ?

-‎ মহারাজ, নিশ্চিন্ত হন, আমরা জয়লাভ করেছি! ওদিকে অসংখ্য বর্গী হতাহত। মৃত্যুভয়ে বর্গীরা দ্বারকেশ্বর পার হয়ে চলে গেছে। বাকী সৈন্য ভাস্কর পণ্ডিত সহ পলায়ন করেছে। সম্ভবত বিষ্ণুপুরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত হেঁড়ে পর্বতের জঙ্গলের পথেই গিয়েছে।

-‎ হায়! আমি যদি আজ রাজ্যের প্রতিরক্ষার প্রতি কোনো দায়িত্বপালন করতাম তবে হয়তো অন্য গ্রামগুলিকে বর্গীদের হাতে ছাড়খার হতে হতনা। তুমি আমাদের চিরঋনি করেছ সেনাপতি! তোমার নেতৃত্বেই আজ শত্রুশিবির ছত্রখান হয়েছে।

-‎ক্ষমা করবেন রাজন, আমি গুলন্দাজদের এইরূপ কোনো নির্দেশই দিইনি!

-‎অর্থাৎ ?

-দলমর্দ্দন কামানে কেউই অগ্নিসংযোগ করেনি।

-‎ তোমার ভুল হচ্ছে সেনাপতি, নিশ্চয়ই কোনো গুলন্দাজ তোমার আদেশ অমান্য করে এই ঘটনা ঘঠিয়ে-'

রাজার কথা শেষ হয়নি তখনও, গড়ের অন্যপ্রান্ত থেকে এক কন্ঠস্বর ভেসে এল! 'মহারাজ! মহারাজ! শীঘ্রই আসুন, এক আশ্চর্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি!'রাজা দেখলেন এক অল্পবয়সি গুলন্দাজ। বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে সে, সে সামান্য ধাতস্থ হবার পশ্চাৎ রাজা তাকে প্রশ্ন করলেন 'কী দেখেছ তুমি?'

যুবকটি ঘোরাচ্ছন্ন হয়ে বলতে আরম্ভ করল, 'আপনার নির্দেশমতো আমি সমস্ত রাত মদনমোহনকে ডেকেছি আর বর্গীদের গতিবিধি লক্ষ্য করে গিয়েছি। রাত্রিশেষে যখন বর্গীরা প্রায় গড়ের কাছে এসে গেছে তখন দেখি একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে নীল পোষাক পরা একটি সুদর্শন কিশোর সেইদিকে উর্ধশ্বাসে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। চন্দনের গন্ধে বাতাস ভরে উঠেছে চারিদিকে আর সমস্ত আকাশ আলোকিত তার অঙ্গজ্যোতিতে। আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম। তারপর জ্ঞান হলে, দেখি বর্গীদের প্রাণ নিয়ে পলায়নের হুড়োহুড়ি। তারপর শত খুঁজেও তাকে আর দেখতে পেলাম না।'

রাজার চোখ জলে ভরে উঠল, রোমাঞ্চিত হল সর্বাঙ্গ! রুদ্ধ কন্ঠে বললেন, 'কোথায় খুঁজবে তাঁকে? সর্বস্থানে যে তাঁরই বাস! ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়েছেন! তিনি এসেছেন, সকলকে রক্ষা করে তিনি হয়তো মন্দিরে গমন করেছেন! আমি একটিবার তাঁর দর্শন করেই আসব।'

রাজা গোপাল সিংহ হরিনাম জপ করতে করতে গড় থেকে প্রস্থান করলেন।

চা-এ চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- 'মদনমোহন মন্দিরে গিয়েছিলাম?'

অম্বর বলল 'না বোধহয়। খোলা থাকলে চল ঘুরে আসি। এই বিয়ের বাজার শেষ হবে বলে মনে হয় না।

-'হুম। চল আরেক রাউন্ড দিই!'

কালকের মতো দুই ভাই বেরিয়ে পড়লাম। চলে গেলাম মদনমোহনের মন্দিরে। টেরাকোটার কাজের উপরে বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে একটি রক্তিম আভার সৃষ্টি করছে! চমৎকার দৃশ্যটি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল!

অম্বর প্রাউডলি বলল 'কেমন নিয়ে এলাম বল?'

বললাম, 'সবই ঠিক ছিল রে, শুধু কৃষ্ণ কেন কামান দাগছিলেন এটাই বোধহয় জানা গেলনা। শুধুই কী নকশা নাকি কোনো লেজেন্ড?'

- 'লেজেন্ডই বটে।'

আমরা মন্দিরের রাসমঞ্চের উপর বসে গল্প করছিলাম। পাশে এক বয়স্ক লোক কখন যে এসে দাঁড়িয়েছিলেন জানতাম না।

- ‎'আপনারা টুরিস্ট?!

- ‎'হ্যাঁ।'

- ‎'আপনি আমায় চিনবেন না, তবে আপনাদের কৌতূহলের উত্তর হয়তো আমার জানা আছে।'

ভারী অদ্ভূত লোক! যেচে পড়ে কে গল্প করতে আসে এইভাবে? অম্বর ততক্ষণে ভাব জমিয়ে নিয়েছে, ভদ্রলোক বললেন, 'আপনাদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু এই মদনমোহন মন্দিরকে ঘিরেই। বিশ্বাস করবেন কী না জানিনা তবে মানুষের নিরাকার বিশ্বাস যখন আকার ধারণ করে তখন সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ছাপিয়ে যায়।' লোকটার কথাগুলি বোধগম্য হল না তবে বেশ রোমাঞ্চকর লাগল। উনি বলে চললেন,'হাম্বিরের বৈষ্ণবধর্ম গ্রহনের পরে গোপাল সিংহের রাজত্বকালে বৈষ্ণবধর্ম বেশী প্রাধান্য পায়। রাজা নিজেও কৃষ্ণ ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকতেন। অবশেষে এক নিয়মের সৃষ্টি করলেন - যে প্রজা তিন বেলা নিয়ম করে হরিনাম জপবে না, তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

এইরূপে সব চলছিল। মল্লভূমের শোভা তখন গগনচুম্বী। কিন্তু, সুখ সমৃদ্ধিই কী সব? প্রতিরক্ষা হেতু রাজার ঔদাসিন্য প্রকট হয়ে উঠল, যার ফলে ঝাড়খণ্ডের গভীর জঙ্গল অতিক্রম করে মল্লভূমে প্রবেশ করেন মারাঠার ভাস্কর পণ্ডিত। উদ্দেশ্য বিষ্ণুপুর লুণ্ঠন। বিষ্ণুপুরের দক্ষিণে গড়ের বাইরে ফেললেন বিশাল ছাউনি।এদিকে বর্গী সৈন্যের এক প্রকান্ড দল নায়ক ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে যোগ দেয়, ফলে তাদের শক্তি আরো বৃদ্ধি হয়। আর এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কুম্ভস্থল জয়পুরের অধিনায়কেরা। সংবাদ পৌঁছায় বিষ্ণুপুর রাজদরবারে। কিন্তু ধর্মীয় ভক্তিভাবে আত্মনিবেদিত রাজা গোপালসিংহদেবকে জানালে তিনি কোন প্রতিকারের চেষ্টা করেননি। যুবরাজ কৃষ্ণসিংহদেব কুমার গোবিন্দসিংহদেবকে সঙ্গে নিয়ে পিতার অজ্ঞাতসারে সামরিক শক্তিকে যথাসম্ভব শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করেন। কিছু সৈন্য গড় রক্ষার জন্য রেখে অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে চলে যান মুণ্ডমালা ঘাটে।চতুর ভাস্কর পণ্ডিত কাউকে জানতে না দিয়ে পরিখা কেটে এগিয়ে যেতে থাকে,ফলে কামান ও গোলাগুলির আঘাত তাদের মাথার উপর দিয়ে পার হয়ে যায়। সকলে সংবাদ দেয় গোপালসিংহদেবকে কিন্তু রাজা তাঁর ভক্তি নিষ্ঠায় অবিচলিত থাকে। সকলকে নির্দেশ দেন মদনমোহনের হাতে সমর্পিত রাজ্য রক্ষা করার হ'লে তিনিই করবেন।'

-'তারপর?'

-‎'গোটা রাজ্য যদি একমনে নগরদেবতার প্রার্থনা করে, ভগবান সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে? দল আর মাদল নামক ভয়াল কামানে শ্রীকৃষ্ণ নিজে ৮০ মণ বারুদ ঢুকিয়ে অগ্নিসংযোগ করে বর্গীদের বধ করেন!'

আমাদের গায়ে কাঁটা দিল!

-'মদনমোহন নিজে এসেছেন?'

-‎'অবশ্যই! কথায় আছে 'বিশ্বাসে মেলায় বস্তুু'। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তো নিজেই কথা বলতেন মা ভবতারিনীর সঙ্গে।

-‎'তারপর রাজার কী হল?'

-‎' রাজা যখন শুনলেন যে কেউই কামান দাগেনি তিনি তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করলেন মদনমোহন মন্দিরের উদ্দেশ্যে...'

ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। গোপাল সিংহ পথ দিয়ে হেঁটে চলেছেন। মুখে হরিনাম! কিন্তু মন্দিরে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এক গোয়ালা। করজোড়ে বলেন 'প্রভু, আপনার দরবারেই আমি যেতাম। আপনার পুত্র তার একটি সোনার বালা আমার কাছে বাঁধা রেখে গেছে।'

রাজা অবাক হয়ে গেলেন। গোয়ালা বলছে, 'আমি মদনমোহনের জন্য দই নিয়ে আসছিলাম এমন সময় নীল পোষাক পরা একটি ছেলে গাছ তলায় বিশ্রাম করছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ এসে বলে যে বর্গীদের সাথে লড়াই করে সে খুব ক্লান্ত। পিপাসায় ভেতর শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাকে কিছু দই দাও,খেয়ে তৃষ্ণা মেটাই। দেখলাম সারা অঙ্গে বারুদ। এক নিঃশ্বাসে প্রায় সাড়ে ষোল মণ দই খেয়ে নিল! যাবার সময় দাম না দিয়ে তার একটি সোনার বালা দিয়ে বলল বাবাকে এটা দেখালেই তোমার সব দোষ মাফ করে দেবেন। প্রভু দেখুন, আমার দইয়ের হাঁড়িগুলি সোনায় পরিণত হয়েছে, দেখুন!'

বালা দেখে রাজা চমকে উঠলেন! এই বালা তিনিই গড়েছিলেন মদনমোহনের জন্য! ব্যাকুলভাবে নামসংকীর্তন করতে করতে রাজা মন্দিরের দিকে ধাবিত হলেন। সজোরে মন্দিরের কপাট খুলতেই গর্ভগৃহ থেকে ভেসে এল বারুদের বিকট গন্ধ!

সূযর্দ্বয়ের শুভ্র আলোকে রাজা যা দেখলেন তাতে তিনি মূর্ছিত হলেন। বেদীতে দণ্ডায়মান অবস্থায় বংশীধারী মদনমোহন। হাতদুটিতে মাখা রয়েছে বারুদের কালি এবং একহাতে নেই সোনার বালা!

Reference

ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য (Facebook)