Golden Cauldron Logo

একতান


by published


রিনি জানত মন্দির বলতে শুধু কালীঘাট মন্দিরকেই বোঝায়। তাদের সেকেলে বাড়ির দোতলার বারান্দার ঠিক নীচ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে, সেই মহিম হালদার স্ট্রিট ধরে ওইদিকটায় গেলেই তো! বিকেলে যখন রিনি তিনতলার ছাদে ওঠে, 'বড়ো তরফের' বাবানের সঙ্গে খেলতে, তখন দুজনেই একসঙ্গে সেই মন্দিরের চূড়া দেখতে পায়। বাবানকে কেন “বড়ো তরফ” বলে, আর বাবানরাই বা ওকে কেন “ছোটো তরফ” বলে, তা রিনির জানা নেই। বাবানকে জিজ্ঞাসা করতে অনেক ভেবে ও বলেছিল, "এই যে তুই আর আমি একটা বাড়িতে থেকেও আলাদা আলাদা থাকি, তাই আমাদের এরকম বলতে হয়।" রিনি বুঝতে পারেনা, একসঙ্গে থেকেও কেনই বা এই আলাদা থাকা...

যাকগে, আসা যাক মন্দিরের কথায়। রিনি ভাবতেই পারেনা, মন্দির দিয়ে কী করে একটা শহর গড়ে ওঠে! মধুদাদা কী যেন বলল নামটা... হ্যাঁ... 'মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর'...

কদিন হল আম্মা আর দাদুর সঙ্গে রিনি ঘুরতে এসেছে এই জায়গাটায়। দাদুর এক পুরনো বন্ধু অরুণ দাদু আর মণিদিদার বাড়িতে এসে উঠেছে ওরা। পরীক্ষার পরে কোথাও যে একটা যাওয়া হবে রিনি জানতো, অবশ্য বাবা-মায়ের বদলে আম্মা-দাদু যে ওর বেড়ানোর সঙ্গী হবে... এটা রিনি কল্পনাই করতে পারেনি। কিন্তু বিষ্ণুপুরে এসে রিনির প্রথমে মোটেই ভালো লাগছিলনা। এখানে বাবানের মতো কেউ ওর সঙ্গে খেলার নেই। আম্মা তো মণিদিদার সঙ্গে সারাক্ষণ হয় রান্না করছে, নয় গল্প করছে... আর দাদু আর অরুণদাদু সারাটা দিন মজে আছেন দাবাখেলায়। হ্যাঁ এখানে বাড়ির মাঝখানের উঠোনটা বেশ বড়ো, আর ঠাকুরদালানটা তো লুকোচুরি খেলার একেবারে আদর্শ জায়গা... কিন্তু একলা একলা কী খেলা যায়? তার মধ্যে যদিওবা ভাব হল মধুদাদার সঙ্গে, কিন্তু মধুদাদা এতই ব্যস্ত... কখন রিনির সঙ্গে খেলবে বা গপ্পো করবে?

তাই মরিয়া হয়ে রিনি দাদুদের কাছে গিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল, এখনি কলকাতায় ফিরে যাওয়া যাক, আর একটুও ভালোলাগছে না। তখনই তো অরুণদাদু ঠিক করে ফেলল যে মধুদাদাই রিনিকে এই বিষ্ণুপুরের চারিদিক ঘুরিয়ে দেখাবে।

মধুদাদাকে রিনির ভারী পছন্দ হয়েছে। বারবার মনে হয়, ওর নিজের যদি একটা দাদা থাকত, তবে সে মধুদাদার মতোই হত। এখানকার মাটির রঙ কলকাতার মতো নয়, কী সুন্দর লালচে রঙের। একলা একলা খেলতে গিয়ে রিনি দেখেছে, লালচে রঙের এই ধুলোয় যে গন্ধ, মধুদাদার গায়েও ঠিক সেইরকম সুন্দর গন্ধ। সাইকেলের সামনে বসিয়ে বিকেলের নরম বাতাসে মধুদাদা ওকে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের গল্প শোনাচ্ছিল। শুনতে শুনতে রিনি অবাক...

"সত্যি বলছো মধুদাদা? শ্যামরায় মন্দির চারশো বছর আগে তৈরি? মানে কালীঘাট মন্দিরেরও আগে?"

-- "তা জানিনা, তবে এখন তোমাদের কালীঘাটের যে পাকা মন্দির, তার আগেই হবে। মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ তৈরি করেছিলেন। আচ্ছা, এই যে তুমি রাধাশ্যাম মন্দির দেখলে, শ্যামরায় মন্দির দেখলে, এই মন্দিরগুলো তোমাদের কালীক্ষেত্রের, মানে কালীঘাটের মন্দিরের থেকে কোথায় আলাদা বলো তো?"

- "এই মন্দিরগুলো বেশি সুন্দর। দেওয়ালে কত ছবি আঁকা, রঙটাও কেমন সুন্দর। আর এই মন্দিরের ঠাকুর আর আমাদের ওই ঠাকুর তো আলাদা।"

- "হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। এই মন্দির তৈরি হয়েছে পোড়ামাটি দিয়ে। ইংরেজিতে বলে টেরাকোটা। দেশ-বিদেশে এই মন্দির নিয়ে কত কাজ হয়েছে। তবে ঠাকুর কিন্তু আলাদা নয়, সব এক।"

- "কী করে? আমাদের ওখানে তো মা কালী। আর এখানে তো রাধাকৃষ্ণ, আবার কিছু জায়গায় ঠাকুরই নেই।"

- "মূর্তিগুলো আলাদা, কিন্তু আসলে কেউ আলাদা নয়। তুমি একটা মজার মিল দেখবে? মা কালী; 'ক' দিয়ে শুরু, আবার কৃষ্ণ; সেখানেও 'ক'। আবার তুমি দেখো, অরুণ মামার পাশের বাড়িতে যে মনিরুল দাদা, মনিরুল দাদার এক ঠাকুর আছে, আর একটা বইও আছে। তার নাম কোরান। সেখানেও একটা 'ক'।"

- "তাহলে আমাদের স্কুলে সিস্টার যে গডের কথা বলেন, তাঁর ছেলের নাম তো ক্রাইস্ট। সেখানেও..."

- "সেখানেও 'ক'। কেমন মিল দেখো! জানো রিনি, সবাইকে আলাদা আলাদা মনে হলেও, আসলে কিন্তু সবাই একসঙ্গেই থাকে। তুমি, আমি, সবাই... এই গোটা দেশে আমরা একসঙ্গে থাকি, এই গোটা পৃথিবীতেই আমরা একসঙ্গে থাকি। কারুর আলাদা থাকা হয়না কিন্তু। "

- "সবাই?"

- "সবাই। এই যে আজ তুমি রাসমঞ্চে গিয়ে এত্ত ছোটাছুটি করলে, কত বছর আগে আমাদের মল্লরাজা বীরহাম্বির ওটা বানিয়েছিলেন... আজ উনি আমাদের সঙ্গেই রয়ে গেছেন ওই রাসমঞ্চের মধ্যে দিয়ে। ওঁকে আমরা দেখতে পাইনা, কিন্তু আমাদের সঙ্গে যা রয়ে গেছে, বড়ো হলে জানবে, তার নাম ইতিহাস।"

- "তাই? তাহলে এই পৃথিবীতে সবাই, সবকিছু, যা আমরা দেখতে পাই আর পাইনা... একসঙ্গেই থাকে?"

- "হ্যাঁ।"

সন্ধ্যার পেলব অন্ধকারে সাইকেলটা আসছিল সরু পথ দিয়ে। মুখে লাগছে নরম হাওয়ার ঝাপট, রিনির ক্লান্ত চোখ জুড়িয়ে আসছিল। একটা একটা করে রাস্তার আলো জ্বলে উঠছে... শঙ্খ-ঘন্টার ধ্বনি ভেসে আসছে। মদনমোহন মন্দিরে আরতি শুরু হয়ে গিয়েছে।

আজ জোড়বাংলা মন্দির দেখা হয়নি। কাল বিকেলে আবার যাওয়া হবে।

কবে বাপ-মাকে হারানো, সদ্য স্কুল পাশ করে মামার বাড়িতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করা রিনির 'মধুদাদা' কী সহজ, কী অনায়াস সুরে গুনগুন করে চলেছে...

"সে যে ওই ভাঙাগড়ার তালে তালে
নেচে যায় দেশে দেশে কালে কালে।।
আকাশে দুই হাতে প্রেম বিলায় ও কে
সে সুধা ছড়িয়ে গেল লোকে লোকে...."