Golden Cauldron Logo

লৌকিক, অতিলৌকিক


by published


পরম করুণাময় ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি , মনুষ্য প্রজাতি । মানুষকেই ঈশ্বর সেই শক্তি দিয়েছেন যার দ্বারা সে স্রষ্টা কে জানতে পারে । তাছাড়া, আরো অনেক কিছুই সে চাইলেই জানতে পারে, যা খালি চোখে দেখা যায় না । যেমন – করোনার বীজাণু, অথবা ভূত !

ভূত নিয়ে মানুষের মেলা কৌতুহল, কেউ কেউ নাকি ভূত দেখেছেন । ভূতের নাকি আবার অনেক প্রকারভেদ ও আছে। বহু মানুষকে এ কথা বলতে বা শুনতে দেখা যায়। আসলে যে ‘ ভূত ' বিষয়টা কী, তা কিন্তু সাধারণত কেউই বিশেষ জানে না ।

বেদান্ত অনুযায়ী, মানুষের আত্মা মোট পাঁচটি আবরণের মধ্যে অবস্থান করে । সব চেয়ে উপরের স্তর , যেটি খালি চোখে দেখা যায়, তার নাম হলো দেহ । আসলে এই দেহ কী ? দেহ হলো খাদ্যের সমষ্টি । অর্থাৎ না খেলে এ চলতে বা কাজ করতে পারে না । তাই দেহকে বলা হয় “ অন্নময় কোষ” ।

এরপর যদি আমরা একটু খেয়াল করি, তবে দেখতে পাবো আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস অনবরত চলছে – এই হলো আমাদের প্রাণ । শ্বাস নেওয়া – ছাড়া – আবার নেওয়া, অর্থাৎ জীবন । আর শ্বাস নেওয়া – ছাড়া – আর শ্বাস না নেওয়া, অর্থাৎ মরণ । সুতরাং অন্নময় কোষের অন্তর্বর্তী আত্মার দ্বিতীয় স্তর হলো “ প্রাণময় কোষ” ।

আমরা আমাদের শ্বাস – প্রশ্বাসের গতি তখনই লক্ষ্য করতে পারি যখন আমরা একাগ্র ভাবে তা নিয়ে চিন্তা করি । এই মনই আমাদের সব । মন নিয়েই আমাদের যত কারবার । মনেই আনন্দ মনেই দুঃখ , মনেরই ভালো লাগা – না লাগা । এক কথায় বলতে গেলে দেহের থেকে মনের সাথেই আমাদের অন্তরঙ্গতা বেশি। আবার মনের খারাপ লাগা বা ভালো লাগার সাথেই শরীরের ভালো- মন্দ অনেকাংশে জড়িত । আর আমাদের এই মনটাই কিন্তু আত্মার উপরের তৃতীয় আবরণ, তথা “ মনোময় কোষ” । মনের আবার চারজন কর্মচারী আছেন, তারা হলেন – চিত্ত , মানস , চেতনা, "ধী”(intellect) । এদের দিয়েই মন সব কাজ করায় ।

আসলে যে দেহ ও মন নিয়ে আমরা সদাই কর্মব্যস্ত থাকি, তাদের কিন্তু আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চালনা করার কথা । নিত্য নৈমিত্তিক প্রয়োজনে আমরা যেন এদের ব্যবহার করতে পারি তাই ঈশ্বর এদের দিয়েছেন । তা না করে, বরং আমরাই কিন্তু এদের দাস হয়ে জীবন কাটাই । যেমন –‘fire is a good servant but a bad master’ ঠিক তেমনি আমাদের দেহ আর মন আমাদেরই চাকর হিসেবে খুবই ভালো, কিন্তু মনিব হিসেবে খুব খারাপ । দুঃখের বিষয় এই যে , না জেনেই আমরা সারা জীবন চাকরকে মনিব বানিয়ে রাখি । সুতরাং পাওয়া না-পাওয়ার দোলায় দুলে জীবনকে সমস্যায় জর্জরিত করে তুলি ।

সে যাই হোক, এবার আসবো next faculty বা 4th layer of the soul – “বিজ্ঞানময় কোষ” এর কথায় । যখন কোনো বিষয় কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অথবা সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আমরা যুক্তি-তর্কের সাহায্য নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হই, তখন আমরা বিজ্ঞানময় কোষেরই সাহায্য নিয়ে থাকি । যাকে বলি ‘বুদ্ধি’ । বুদ্ধি আমাদের আবেগ কে লাগাম দেয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে । আমাদের যদি একমনে পদ্মাসনে বসে ৫মিনিট থাকতে বলা হয়, এবং আমরা তা করি ( রাতে ঘুমানোর আগে ও ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর ), তবে এই স্তরগুলি প্রতি নিয়ত অভ্যাসের ফলে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে আসবে ।

অবশ্যম্ভাবী ভাবেই আমরা তা পারবো না। কারণ – রাত্রি ১২ টার পরই high speed net connection থাকে,সুতরাং কম করেও রাত ৩টে-সাড়ে ৩টে পর্যন্ত আমাদের জেগে থাকতেই হবে । ফল – বেলা ১১ টায় ঘুম থেকে ওঠা । ছোটবেলায় শেখা “early to bed and early to rise” ……. এখন কেবলই শিশু পাঠ্যর অন্তর্গত।

সে যাই বলি না কেন , আমরা কিন্তু সবাই জীবনে আনন্দ খুঁজতে চাই । আনন্দ আসলে আমরা মনে অনুভব করি – এটা আমরা জানি । বাইরের পৃথিবীর আকর্ষণ আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে মনে প্রবেশ করলেই মন তাতে সাড়া দেয় আর তখনই আমরা আনন্দ পাই- এটা কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না । যেমন আখের মধ্যেই মিষ্টি , যেমন আগুনের মধ্যেই দাহিকা শক্তি, ঠিক তেমনি মনের মধ্যেই আনন্দ থাকে । কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই মন আনন্দিত হয়ে ওঠে, তার কারণ হয়ত আমাদের জানা নেই। যেহেতু মনকে বশ না করে আমরা নিজেরাই মনের বশ্যতা স্বীকার করেছি, তাই 'কারণ ছাড়া হঠাৎ আনন্দিত হওয়া ' – এই ঘটনাকে বিশেষ আমল দি না । বাইরের নতুন নতুন জিনিসের আকর্ষণে মনকে আনন্দিত করে তোলাটাকেই সঠিক বলে ধরে নি । মনের এই কারণ ছাড়া আনন্দের অনুভূতিই “বিজ্ঞানময় কোষ” এর প্রকাশ ।

লেখা শুরু করেছিলাম ভূত নিয়ে- তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ আমি কেমন খাপছাড়া লেখিকা ! তবে বলি – মানুষের যখন মৃত্যু হয়, তখন শুধুমাত্র ওই দেহটার, অর্থাৎ অন্নময় কোষের মৃত্যু হয় । দেহ ছাড়ার সময় আত্মা অন্যান্য স্তর গুলিকে সঙ্গে নিয়ে যায় । তাদের কিন্তু মৃত্যু হয় না । মৃত্যু হয় দেহের । আত্মা তখন মন দ্বারা পরিচালিত । তাই মনের না-পাওয়াগুলো সে পেতে চায় । আসক্ত আত্মা মাঝে মাঝে ভুলেই যায় যে দেহ নামক faculty- টি তার আর নেই । এই দেহহীন মনের কামনা-বাসনাগুলোই অনেক সময় ভূত রূপে মানুষের কাছাকাছি চলে আসে ।

যার জীবনের চাওয়া যত বেশী, তার বিদেহীর ওপর মাধ্যাকর্ষণ তত বেশী । তাই আবার কোনো না কোনো রূপে সেই আত্মা আবার পৃথিবীতে জন্ম নেয় মনের চাহিদা পূরণ করতে । যে মানুষের জীবনের চাওয়া অতি কম, সে নতুন করে পৃথিবীতে জন্মাতে চায় না , কারণ তার ভোগ-বাসনার ইচ্ছা প্রায় নেই বললেই চলে। কর্ম অনুযায়ী সে আত্মা পরমাত্মায় মিলিত হন বা বহু দিন পর জন্ম নেন মনের কোনো একটা বাসনা অপূর্ণ থাকার জন্য ।

মৃত্যুর পর নতুন করে জন্ম নেবার মাঝে বহু স্তর থাকে ।'ভূত' এই স্তর গুলির মধ্যে অন্যতম । এরা কোনো ক্ষতি করতে পারে না , কারণ এদের দেহ নেই । বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য অনেক সময় কিছু শুদ্ধ আত্মা অগ্রিম জানান দেন । প্রবল আসক্তিজনিত কারণে মৃত আত্মা, অনেক সময় প্রিয়জনদের দেখা দেন ।

দুর্ঘটনায় মৃত আত্মা, আত্ম হত্যা, অল্প বয়সে হঠাৎ মৃত্যু , ইত্যাদি আত্মা আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে না। অনেক সময় তান্ত্রিকরা এই সব আত্মদেরকে বশীভূত করে নিজেদের কাজে লাগায় । এই ধরনের আত্মারা অত্যন্ত কষ্টে থাকেন । তাই সর্বধর্মেই মৃত আত্মাদের জন্য প্রার্থনা করার রীতি প্রচলিত আছে । যেসব মানুষের মনে সর্বদাই পরোপকারের ভাবনা কাজ করে, তারা সাধারণত এদের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেন ।