Golden Cauldron Logo

শক্তিরূপেণ সংস্থিতা


by published


"আশ্বিনের এক প্রাগৈতিহাসিক সকালে শ্রীরামচন্দ্র যে দুর্গার বোধন করেছিলেন, স্বর্গের দেবপুরুষগণ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, যে রণদেবীকে অসুর নিধনে পাঠিয়েছিলেন- সেই দুর্গাই একুশ শতকে নারীর ক্ষমতায়ন।"

মল্লিকা সেনগুপ্তের 'কন্যাশ্লোক' কবিতাটি শুরু হয় এভাবে। আরো কিছু উদ্ধৃতি মনে পড়ে যায় একই কবিতা থেকে, "বিশ্বায়নে পণ্যায়নে খণ্ড খণ্ড মানচিত্রে বাংলা বিহার রাজস্থানে সাধারণী নমস্তুতে" আসলে তো আমার দুর্গা সত্যিই "নারী গর্ভের রক্তমাংস কন্যা।" যে সমাজ হাজার বছরের ইতিহাসের পথ পেরিয়ে, মধ্যযুগের অন্ধকার পেরিয়ে, ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ পেরিয়ে, যুদ্ধ-বিদ্রোহ-সংগ্রাম পেরিয়ে আজও এই কন্যাজন্ম লোহার বেড়াজালে, ভারী পর্দার অবগুণ্ঠনে ঢেকে দেয়, সেই সমাজেরই 'সবচেয়ে বড়ো উৎসব'-এর কেন্দ্রে এক নারী।

ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে যুক্তি – পরম্পরায় বিচার করে লিখতে বসলে সে তর্কের শেষ নেই। শুধু আজকের সমাজে বসবাস করা এক সাধারণ নারী, এক সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে যতটুকু দেখতে পাই, অনুভব করতে পারি, সেটুকুই থাক এই লেখায়।

আজ একবিংশ শতাব্দী। আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতার যুগ পেরিয়ে আমাদের পথ ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী হয়ে উঠছে। হাতের মুঠোতেও নয়, আজ আপামর বিশ্ব সংসার যেন আমাদের আঙুলের স্পর্শে। তবু প্রশ্ন জাগে; আলোর আবরণ ভেদ করে সমাজের অন্তরালে, যেখানে অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। সমাজের শুধুমাত্র সেই স্তরটায় নয়, যা আমাদের মতো 'ভদ্রলোক'-এর কাছে নিচু, যেখানে নেশাগ্রস্ত পুরুষ রোজ বউ পেটায়, দারিদ্র‍্যের জ্বালায় কোনো এক মেয়ের জীবন মোড় নেয় চোরা পথের বাঁকে, প্রতিনিয়ত শারীরিক মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে করতে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হয় নারীকে; এই অন্ধকার সমাজের সেই স্তরেও আছে, যেখানে শিক্ষার আলো, স্বচ্ছলতার আলো দিবারাত্রি বিরাজমান, যেখানে মানবচেতনার জ্ঞান 'টনটনে', কিন্তু সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েমানুষ? তারা বাইরের 'মেয়েছেলে'-দের মতো ঘুরে বেড়ায়না, তাদের কাজ সন্তান মানুষ করা, স্বামীর সেবা করা। হ্যাঁ, এখনো এই সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছে 'ফেমিনিসম' শব্দটা ঠাট্টার চেয়ে আর বেশি কিছুই নয়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নারীর স্বপ্নে ইতি টানে তারই নিকটজন, বয়ঃজ্যেষ্ঠারা, ঘটনাচক্রে তাঁরাও নারী... "মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছিস মা, এইটুকু মানিয়ে নে, এইটুকু।"

“এইটুকু”-ই বাড়তে বাড়তে গিয়ে দাঁড়ায় লাঞ্ছনায়, অত্যাচারে, কটূক্তিতে; যে আকার ধারণ করে, তার নাম আমরা জানতে পারি সংবাদপত্রের পাতায়, খবরের চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায়... "পণ দিতে না পারায় বধূহত্যা"..."ধর্ষণ"..."নারী পাচার"... "ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা"...

সমাজের বুকে কান পাতলে শয়ে শয়ে কন্যাভ্রুণের কান্না শোনা যায় আজও। স্বস্তির কান্না। ভাগ্যিস, এই পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তারা মিশে গেছে অন্ধকারে!

তবু আমরা 'আধুনিক'। আমরা নারীবাদী, আমরা মানবীচেতনায় পরিপূর্ণ। আমরা এগিয়েছি অনেক পথ। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সিনেমা, থিয়েটারের ধারা বদলেছে; গল্প লেখা হয়েছে নারীকে কেন্দ্র করে। তার জন্য দু-চারটে পুরস্কারও ঘোষিত হয়েছে, ঘোষিত হয় প্রতি বছর। লড়াই করে মেডেল পাওয়ার পরে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে বলেছে, "বাঃ রে মেয়ে, বাঃ".... তবু আমরা কতবার জোর গলায় বলতে পারি, " আজ মেয়েরা সত্যিই স্বাধীন, আজ মেয়েরা তাদের আপন ভাগ্য জয় করেছে?" কতবার? রাষ্ট্র নীরব থাকে। স্বাধীনতা, ভাগ্য জয় করা তো অনেক দূরের কথা, মেয়েরা নিরাপদ কিনা সেটুকুও সে নিশ্চিত নয়।

বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসব দুর্গাপুজো। প্রতিবছর আসে। যিনি সকল শক্তির উৎস, যাঁর শক্তির কাছে সমস্ত স্থাবরজঙ্গম নতশির হয়, সেই মহাদেবীর জয়গানে মুখরিত হয় আকাশ-বাতাস। মণ্ডপে মণ্ডপে মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তির বুকের ভেতর প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে যেন। সেখানে অবিরাম কেউ কেঁদে চলেছে... যে কাঁদছে, তার নাম নির্ভয়া, না আসিফা, না প্রিয়াঙ্কা, না মনীষা, নাকি সেই নামহারা মা, যাঁকে সমাজ বলে 'বেশ্যা', কিন্তু যাঁর ঘরের মাটি ছাড়া 'দুগ্গাপুজো' হয়না... কেউ জানেনা। সেই মুহূর্তে এত আলো, এত আড়ম্বর সব ফিকে হয়ে যায়; অর্থহীন, মিথ্যে হয়ে যায়।

তবুও তো 'আশ্বিনের শারদপ্রাতে' বেজে ওঠে 'আলোকমঞ্জির'। এই প্রকৃতি, এই সমাজের জরাজীর্ণ সত্তা থাকে মহামায়া সনাতনীর অপেক্ষায়। একদিন ঝড় থামবে, ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে, হিংসা-প্রতিহিংসা, খুন-জখম-রাহাজানি শেষে এই পৃথিবী আবার সুন্দর হবে, এই আশায়। বাস্তবের রক্তমাংসের দুর্গাদের হাতে উঠবে অস্ত্র, শয়ে শয়ে অসুর নিধন হবে; শক্তিময়ী, দীপ্তিময়ী, কল্যাণময়ী নারীর পায়ের শৃঙ্খল ছিন্ন হবে... সত্যিই এমন আশার আলো জ্বলে উঠবে:

"আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে
আমার দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে।"
(কন্যাশ্লোক, মল্লিকা সেনগুপ্ত)