Golden Cauldron Logo

যেভাবে গঙ্গামাটির প্রতিমা নির্মাণ হল...


by published


দিন কয়েক আগে গড়িয়াহাটে গিয়েছিলাম। আগের মতো রাস্তায় বা দোকানে হয়তো ভিড় নেই তবে অবাক হলাম পূজা প্রস্তুতি দেখে! দেখলাম, শহর সেজে উঠছে ধীরে ধীরে। কোভিডের আগে ঠিক এই সময়েই মন্ডপ সজ্জা, আলোক সজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ ইত্যাদি, থাকত তুঙ্গে। তবে এই ব্যাস্ততার মাঝে, অনেকেরই হয়তো মনে প্রশ্ন আসে এই প্রতিমা গড়ার পদ্ধতি নিয়ে। মন্ডপের দেবী মূর্তি তো কাঠ, পাথর বা অন্য কোনো ধাতু দিয়ে গড়াই যেতো! মৃৎশিল্পী কেন গঙ্গামাটিকেই প্রথম প্রাধান্য দেন? পলিমাটির নমনীয়তা সহজেই আকৃতি নেয় ঠিকই, কিন্তু এই মাটি দিয়ে ঠাকুর গড়ার উৎস জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ১০২৬ বছর আগে! বাংলায় যখন চৈতন্য মহাপ্রভুর বা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের আগমন ঘটেনি। তখন ছিল, মল্লরাজত্বের স্বর্ণযুগ! এই মল্লবংশের ১৯তম রাজা, জগৎ মল্লের এক রোমাঞ্চকর কাহিনীকে কেন্দ্র করে আমরা শুনব গঙ্গামাটি ব্যাবহারের ইতিকথা।

সাল ৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ। মল্লভূমের রাজধানী প্রদ্যুন্মপুর থেকে বহু ক্রোশ দূরে এক গভীর অরণ্য। রাজা জগৎ মল্ল সেখানে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন এক অনন্য সুন্দর 'হরিণ'-এর পিছনে। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় ছুটতে ছুটতে রাজা কখন যে পথ হারিয়ে ফেললেন তিনি তা জানতেই পারলেন না। একদিকে মৃগরূপী মারীচের মতো হরিণটা তীব্রবেগে চলেছে, আর অন্যদিকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রামচন্দ্রের মতো, রাজা জগৎ মল্ল-ও তার দিকে ধাবিত হচ্ছেন। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ? একসময়ে হরিণকে পাল্লা দেওয়া তাঁর কাছে কঠিন বোধ হল। রাজা অবশেষে শ্রান্ত হয়ে পড়লেন এবং হরিণটাও যেন ঘন জঙ্গলের সঙ্গে মিলিয়ে গেল! এক স্থানে রাজা ঘোড়া থামিয়ে বিশ্রামের জন্য নামলেন, কিন্তু আচমকা এক অদ্ভূত দৃশ্য দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন।

বেশ কিছুটা দূরে একটি প্রকান্ড গাছ। তার ছায়ায় একটি বক আপনমনে ঘোরাফেরা করছে আর গাছটার ঠিক উপরে বসে আছে এক ক্ষুধার্ত বাজপাখি। বাজপাখির দৃষ্টি রয়েছে ঠিক বকটার দিকেই। এমন সময় চোখের নিমেষে বাজ ঝাঁপিয়ে পড়ল বকটির উপরে। কিন্তু একি! বকের গায়ে তার ধারালো নখ বসানোর আগেই বাজপাখিকে কে যেন ধাক্কা দিল। টাল সামলাতে না পেরে পাখিটা ছিটকে পড়ে যায় অনতিদূরে। রাজা অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন, বাজপাখি বহুবার চেষ্টা করল আক্রমণ করার কিন্তু বকের গায়ে একটি আঁচড় পর্যন্ত কাটতে পারল না। বরং সে নিজেই বারংবার কীসের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাচ্ছে। যেন কোনো এক অলৌকিক বল তাকে ক্রমাগত বাধা দিচ্ছে। অতঃপর চোখের সামনে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির যথার্থতা পরখ করার জন্য মল্লরাজ বককে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করলেন। উদ্দেশ্য- 'এরপরেও যদি বক জীবিত থাকে, তবে জানব এই স্থান কোনো সাধারণ স্থান নয়। এর মাহাত্ম্য সুগভীর!' বলা বাহুল্য বকের গায়ে তীর তো স্পর্শ করলই না বরং একটি গগনভেদী কন্ঠে রাজা দিক্‌বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন! বিকেলের পড়ন্ত রোদে যা শুনলেন তাতে তিনি চমকে উঠলেন। এক নারীর কন্ঠস্বর! গম্ভীর, দৃঢ়। তবে তার উৎস কোথায় রাজা ঠাহর করতে পারলেন না। তিনি বলছেন - 'পুত্র, আমি বক নই, বাজ নই, আমি হরিণও নই। আমি আদিশক্তি, পরমাপ্রকৃতি। আমার ইচ্ছেতেই তুমি এই ঘোর বনে প্রবেশ করেছ। যা দেখেছ তা আমিই তোমায় দেখিয়েছি। এই স্থান বড়োই পবিত্র। আমার মুখমন্ডলের অবয়ব এই স্থানে নীহিত আছে। তুমি আমার মুখাবয়ব তোমার রাজধানীতে নিয়ে গিয়ে আমার পূর্ণাঙ্গ শরীর নির্মাণ করো।'

বাস্তবিকই, রাজা তক্ষুণি মাটি খুঁড়ে একটি মুখমন্ডলের অবয়ব পেয়েছিলেন। প্রদ্যুন্মপুরে ফিরে আসবার পর রাজা দেবীর পূর্ণাঙ্গমূর্তি তৈরীর নির্দেশ দেন। কথা অনুযায়ী গঙ্গামাটি দিয়ে নির্মিত হল দেবীর শরীর। মুখমন্ডলের উপর লেপন করা হল সেই গঙ্গামাটি। ধীরে ধীরে মাটি দিয়ে দেবীমূর্তিকে এক বিশেষ আকার দেওয়া হল, আর এভাবেই শুরু হল গঙ্গামাটির দ্বারা প্রতিমা নির্মাণের চিরাচরিত চল। যেহেতু মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়া হয়েছে, তাই দেবী দুর্গা 'মৃণ্ময়ী' নামে পূজিতা। কথিত আছে যে রাজা দেবীকে স্বপ্নেও দেখতে পান; দেবী বলছেন – “বৎস, আমার আরাধনা করবার স্থান আমি নিজেই স্থির করেছি। তোমার রাজধানী বিষ্ণুপুরে স্থাপন করো, আমি সেখানেই তোমাদের পূজা গ্রহণ করব। তোমাদের রক্ষা করব।” এরপরে রাজা নিজের রাজধানী প্রদ্যুন্মপুর থেকে বিষ্ণুপুরে স্থাপন করেন ৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দে আর ৯৯৭ সাল থেকেই দেবীর পূজা শুরু হয় বিষ্ণুপুরে।

মৃন্ময়ী দেবীর পুজো ছাড়াও দুর্গোৎসবে পূজিত হয় একাধিক দেবদেবী। এর নির্মাণশৈলীতেও বৈশিষ্ট লক্ষ্য করা যায়। দেবী এখানে ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী'রূপে বিরাজ করেন। তাঁর ডানদিকে উপরে গণেশ ও নীচে লক্ষী আর বাঁ-দিকে উপরে কার্তিক ও নীচে সরস্বতী। কাঠামোর উপরে শিব, দক্ষ, নন্দী-ভৃঙ্গী, দেবীর দুই অনুচরী প্রভৃতি রয়েছে।

এবার আসি রাজবাড়ীর পূজা পদ্ধতির কথায়। সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পরিবারের দুর্গাপূজার চেয়েও প্রাচীন এই দুর্গোৎসব এবছর ১০২৩ বছরে পা রাখল। জীতাষ্টমী তিথি থেকেই শুরু হয়ে যায় পূজোর শুভ উদ্বোধন! ঢাকে কাঠি পড়াব় সঙ্গে সঙ্গেই 'পোড়ামাটির দেশ'টি যেন মেতে ওঠে! সাজসাজ রব পড়ে যায় চারিদিকে। সেই দিনগুলিতে চণ্ডীপাঠ থেকে শুরু করে পুজোর সব রীতিনীতি রাজবাড়ির দুর্গাপুজোকে এক অন্যমাত্রা দেয়। মৃণ্ময়ীদেবীর পূজো ছাড়াও তাঁর সঙ্গে আরও তিনটি (ধাতু দিয়ে তৈরী) দুর্গাপটের পূজা করা হয় - বড়ঠাকুরুণ, মেজঠাকুরুণ ও ছোটঠাকুরুণ।

বিষ্ণুপুরের অন্যতম আকর্ষণ হলো জীতাষ্টমী তিথিতে কামান দেগে পূজোর শুভ সূচনা করা। তোপধ্বণির মাধ্যমে জানান দেওয়া হয় দেবীর আগমনের বার্তা। রাজা জগৎ মল্লের আমল থেকে এই প্রথা চলে আসছে। রাজবাড়ীর উল্টোদিকে রয়েছে গোপালসায়র। জীতাষ্টমীর পরেরদিন নবমী তিথিতে গোপালসায়রে হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব। সেই মুহূর্তে বড়ঠাকুরুণের রূপোর পটের এক বিশেষ পূজা করে, মৃণ্ময়ী মন্দিরে আনে পুরোহিতেরা। তখন থেকেই আরম্ভ হয় রাজবাড়ীর দুর্গোৎসব।

এরপরে চতুর্থী তিথিতে গোপালসায়র থেকে জল ভর্তি করে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি ঘট। এ দিন মেজঠাকুরুণের পটের পুজো করা হয়। ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় ছোটঠাকুরুণের পট বেলতলায় রেখে পুজো করা হয়। রাজপরিবারের লোকজন ব্যাতীত এই পূজায় কেউ অংশগ্রহণ করে না। ছোটঠাকুরুণের পট সোনা দিয়ে তৈরী। তাই তিনি 'পটেশ্বরী' নামে খ্যাত। বড় ও ছোটঠাকুরুণের দুর্গাপট বংশানুক্রমে আঁকেন শাঁখারিপাড়ার ফৌজদার পরিবারের শিল্পীরা। আগেকার দিনে কামান দাগার পর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে পুজো শুরু হত। প্রথা অনুযায়ী এখনও মহাষ্টমীর দিন কামান দেগে শুরু হয় সন্ধি পুজো।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তো বটেই, এমনকী, প্রতিবেশী দেশ থেকেও বহু দর্শনার্থী পূজা দেখতে ভিড় জমান এই রাজবাড়ীতে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস এখানে দেবীর সিংহবাহিনী রূপের দর্শনলাভ করেছিলেন। আর এইভাবে টানা ১৮ দিন ব্যাপি মায়ের আরাধনা হয়। মৃণ্ময়ীদেবীর বিসর্জন হয় না। নবপত্রিকা এবং অন্যান্য দুর্গাপটগুলির বিসর্জন হয়। বিজয়া দশমীর সকালে ওড়ানো হয় নীলকণ্ঠ পাখি। ভক্তদের ঢল নামে তখন, এলাকার সমস্ত বাসিন্দা দুর্গোৎসব মন ভরে উপভোগ করে।

কলকাতার বিরাট পূজা মন্ডপ এবং প্রতিমা আমাদের যতই মুগ্ধ করে তুলুক না কেন, যখন রাজা জগৎ মল্লের কাহিনী আমরা শুনি, এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়! তবে অনেকেই 'Myth' বলে উড়িয়ে দেন। এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যে 'এর আগে কী মহিষাসুরমর্দ্দিনীর পূজো হত না?' অবশ্যই পাল রাজার আমলে শক্তির আরাধনা হত কিন্তু যখন সুনিপুণ ভাবে গঙ্গামাটি দিয়ে তৈরী করা প্রতিমাগুলির দর্শন আমরা করি, তখন কোথাও যেন সেই কিংবদন্তী ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে! মনে মনে ধন্যবাদ জানাই মল্লরাজকে! গঙ্গামাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরীর শিক্ষাটা হয়তো আজ আমরা পেতাম না যদি রাজা দেবীর নির্দেশ অমান্য করতেন।

Image Source - https://www.tripoto.com/trip/i-know-you-know-about-majulibut-do-you-also-know-about-this-frog-shaped-island-5f141743b8daf.amp