Golden Cauldron Logo

অসম্ভবের পৃষ্ঠায় “আদর্শ সমাজ”


by published


"রাজনীতি" কথাটা শুনলেই প্রথমে মাথায় আসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কথা, বিশেষত সেই দলগুলোর কথা যাদের নেতা বা নেত্রীরা তাদের কথা রাখতে সফল হতে পারেননি, চেষ্টা না করেই হোক বা করেই হোক। রাজনীতির কথা উঠলেই মানুষ নেতানেত্রীদের ভুল প্রমাণ করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা নিজেরা কি কোনোদিন পারবে একটা আদর্শ ও শ্রেষ্ঠ সমাজ গড়ে তুলতে? আমার মনে হয় না। তারা হয়তো চাইবেও না, ভাববেও না। তার কারণ সেই শক্তিটা থাকলে তাকে গোটা সমাজের কথা শুনতে ও ভাবতে হবে, শুধু নিজের স্বার্থের দিকে নজর রাখলে চলবে না। আমাদের সকলেরই আদর্শ সমাজ নিয়ে আলাদা আলাদা ধারণা আছে। অতএব আজ যদি একজন নেতা বা নেত্রী তাঁর ধারণা বা পরিকল্পনাকে সঠিক ভেবে সেটাকে আকার দিতে চায়, তবে তাঁকে বারংবার ভাবতে হবে যাতে সাধারণ মানুষদের প্রত্যাশা তাঁর দ্বারা পূর্ণ হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না যে তা ভেবে কোনো লাভ আছে। দীর্ঘ কালে যদি সেই পরিকল্পনার দ্বারা একটা শ্রেষ্ঠ সমাজ গড়ে নাও ওঠে, এখনকার সমাজের চেয়ে দ্বিগুণও যদি উন্নত হয়, আমার মনে হয় এমন মানুষ সবসময়ই থাকবে যারা তাতেও সন্তুষ্ট হবে না। মানুষ যে কোনোদিনই কোনোকিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারবে না, তা নিয়ে আমাদের কারোরই সন্দেহ নেই। এখনকার সমাজে মানুষ যেটা চায়, সেটা না পেলে তারা সরকারের নামে চারটে খারাপ কথা বলে। কেউ-কেউ আবার ইট দিয়ে কোনো সরকারি ভবনের কাঁচ ভেঙে ফেলে, আর এসবের খবর টিভিতে দিনের পর দিন সব থেকে বেশী গুরুত্ব পেয়ে চলেছে । উল্টো দিকে, মানুষ আজ যেটা চায়, সেটা যদি দেওয়া হয়, দুদিন পরে তারা ভুলেই যাবে যে সেই জিনিসটা তারা কোনোদিন চেয়েছিল। অতএব মানুষের এই অতিরিক্ত লোভই পরোক্ষভাবে সেই "আদর্শ সমাজ" গড়ে তোলার বিরুদ্ধে একটা বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষের ইচ্ছা ও লোভকে বোঝা একটা ঢালু পাহাড় থেকে একটা পাথরকে গড়িয়ে পড়তে দেখার মতন- তা গড়িয়েই যাবে যতক্ষণ না আরেকটা কোনো বড়ো পাথর বা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। সিঙ্গারার সাথে চাটনি না দিলে আমরা যেমন চেয়ে নি, আবার আগে থেকে প্লেটে সিঙ্গারার পাশে চাটনি দেখলেও আমরা আরো চেয়ে নিতে দ্বিধা করিনা।

মানুষ বাইরে থেকে যা দেখায় তা নিজেই অজান্তে অনেক সময় চায় না। একজন মানুষ ডায়াবেটিস এর ভয়ে মিষ্টি খেতে না চাইতেই পারে, তবে সে নিজে মনে মনে ঠিক জানে যে সামনের জন যদি আর একটু জোর করে, তবে সে অন্তত দুটো রসগোল্লার থেকে আর মুখ ফেরাতে পারবে না। অতএব আমরাই যদি না জানি যে আমরা কেমন সমাজ চাই, তাহলে সেই নিখুঁত সমাজ গড়ে না ওঠার জন্য দায়ী কিন্তু আমরাই।

আমরা সকলেই বারংবার সেই মদ্যপ চালকদের কথা শুনেছি, পড়েছি এবং হয়তো দেখেওছি যারা সামান্য একটা গাড়ি দায়িত্বশীল ভাবে চালাতে না পেরে নিজেদের প্রাণ হারিয়েছে।যদিও একটা সামান্য গাড়ি চালানো আর একটা গোটা দেশ বা রাজ্যকে সামলানোর মধ্যে আকাশ - পাতাল পার্থক্য। কিন্তু মানুষ যদি গাড়ি চালানোর মতো দৈনন্দিন কাজও দায়সারা ভাবে করে, তাহলে খবরের কাগজে সেই "মাতাল ট্রাক ড্রাইভার" এর গল্প পড়ে "এই দেশের আর কিছু হবে না!" বলে দু-চার মিনিটের মধ্যেই আবার সরকারকে অভিযুক্ত করার পৃষ্ঠায় ফেরাটা আমাদের তরফ থেকে নৈতিক একেবারেই নয়।

সাধারণত সমস্ত পরিকল্পনারই কিছু ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব হয়। জনগণ কেবল তাদের নিজেদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের কথা ভাবে। সেখানে একজন নেতা বা নেত্রীকে বর্তমানের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বুঝে এক উত্তম ভবিষ্যতের দৃষ্টিতে মগ্ন থাকতে হয়। আজ কাল বেশির ভাগ মানুষই চায় যে এক গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা তাদের দেশ চালনা করা হোক কারণ তারা তাদের প্রতিনিধি নিজেরা নির্বাচন করতে চায়। তবুও মানুষের মনে বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তার স্থান থাকে না। নির্বাচনের সময় তারা যাদের ভোট দেয়, কিছু মাস বা বছর পর সেই সরকারই বড়ো কোনো সিদ্ধান্ত নিলে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারা কেবলমাত্র নেতিবাচক ফলাফল গুনতেই নিজেদেরকে ব্যস্ত করে ফেলে। সকালের চা টা এইসমস্ত ভাবনার ঝড়ে যখন নিজের আসল স্বাদটা হারায়, তখন সাধারণ মানুষেরা ধরেই নেয় যে নির্বাচনের সময় তারা খুব একটা ভাবনাচিন্তা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তে ভুল হলেও তারা সেটাকে প্রাধান্য না দিয়ে সেই ঠান্ডা চায়ের জন্য সরকারের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়। সরকারের তরফ থেকেও ভুল হতেই পারে, এবং সেরকম হলেও এটা ভোলা চলে না যে সেই সরকার এতো ক্ষমতা পেয়েছে সাধারণ মানুষদের জন্যই।

বড়ো কোনো পরিবর্তনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য তৈরি না হয়ে কেবল আমাদের নিজেদের স্বার্থের দিকে মন দেওয়ার কারণেই সেই "আদর্শ সমাজ" গড়ে তোলাটা এখন অসম্ভবের পৃষ্ঠায় এসে পৌঁছেছে। অতএব গোড়াতেই যদি গন্ডগোল হয়, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষেরাই বা কে হই জোর গলায় যে যার নিজেদের একার জন্য "আদর্শ সমাজের" চাহিদা রাখার?